একজন ব্যক্তির কোম্পানী

এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানী

ব্যবসায়িক আইন

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে- জাতি হিসেবে আমরা বাঙালিরা এমনিতেই ব্যবসা বিমুখ। তারপরও যদি কেউ একজন কোনমতে কোন একটি ব্যবসা করতে উদ্যোগ নেয় তখন তাকে সামাজিক ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য নানা ধরনের নেতিবাচক কথাবার্তা বলে তার ভিতরকার ইচ্ছের পাশাপাশি স্বপ্নটুকুও নষ্ট করে দেয়। যার ফলে বাঙালি শুধুমাত্র চাকরির পিছনে ছুটে। চাকরি করে দিন শেষে আরেকজনের পকেট ভারি করা বাঙালি চিন্তাভাবনা একবিংশ শতাব্দীতে এসেও তেমন পরিবর্তন হয়নি। এর মাঝেও স্রোতের বিপরীতে সাহস রাখে এমন কেউ কেউ গতানুগতিক চাকরির বাইরে কিভাবে ব্যবসা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো যায় আর পাশাপাশি আরো অনেকের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা যায় সেই চিন্তা মাথায় নিয়েই নতুন নতুন ব্যবসা শুরু করতে চায়। আজকাল ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি উদ্যোক্তার সংখ্যাও বাড়ছে কিন্তু যেহেতু এই পথটি নতুন অচেনা যাত্রা তাই অনেকেই একা পথ চলতে ভয় পায়; সাথে কাউকে নিয়ে চলতে চায়। একটি কথা আছে, যদি দ্রুত চলতে চাও তবে একা চলো আর যদি লম্বা পথ চলতে চাও তাহলে কাউকে সাথে নিয়ে চলো। এরই ধারাবাহিকতায় কেউ যখন নতুন কোনো ব্যবসা করতে চাই, তখন কাউকে সাথে পার্টনার হিসেবে নেয়। একজনকে সাথে নিয়ে কেউ পার্টনারশিপ বা অংশীদারি কারবার শুরু করে আবার কেউবা আছে কোম্পানি নিবন্ধন করে ব্যবসার কার্যক্রম পরিচালনা করে। এবার আসুন আইনে।

কোম্পানি আইন ১৯৯৪ অনুসারে অন্তত দুইজন ব্যক্তি মিলে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি শুরু করতে পারত কিন্তু এখানে দুইজন বলতে সবসময় যে দুজন ব্যক্তি শুরু করত তা কিন্তু নয়। গত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি, কোন কোম্পানির পরিচালককে গ্রেপ্তার করার পাশাপাশি পরিচালকের স্ত্রীকেও গ্রেফতার করা হচ্ছে; কেননা পরিচালকের স্ত্রী ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। আসলে খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে, ওই ব্যক্তি ওই কোম্পানিটি শুরু করতে যাওয়ার সময় সাথে আর কাউকে পায়নি কিন্তু আইন অনুসারে যেহেতু অন্তত দুইজন শেয়ারহোল্ডার ব্যতীত কোম্পানি শুরু করা যায় না তাই নিজের স্ত্রীকে শেয়ারহোল্ডার বানিয়ে কোম্পানি নিবন্ধন করে ছিলেন। এখন স্বামী কোন প্রকার আর্থিক কেলেঙ্কারি বা অনিয়ম করার কারণে মামলায় আসামী হলে সাথে সাথে স্ত্রীকেও মামলার আসামী হতে হচ্ছে। আবার মুদ্রার উল্টো পিঠে ও যদি আমরা দেখি, একটি কোম্পানি শুরু করার সময় স্বামী যখন স্ত্রীকে শেয়ারহোল্ডার বানিয়ে চেয়ারম্যান পদে বসিয়ে দিচ্ছে তার কয়েক বছর পরে কোম্পানি যখন একটি বড় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে এবং আর্থিকভাবে খুবই লাভবান হচ্ছে ঠিক ওই মুহূর্তে স্ত্রী যদি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটায় সে ক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে উনি তা লাভের অংশ এককভাবে ভোগ করতে পারবেন যদিও তা ছিল স্বামীর একক সম্পত্তি বা বেনামী সম্পত্তি। বেনামী সম্পত্তি কি তার জানতে চোখ রাখুন আমাদের ওয়েবসাইট বা ইউটিউব চ্যানেলে।

 

এই ধরনের সমস্যা গুলোর সমাধান করার জন্য এবং ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদেরকে আরো বেশি উৎসাহী করার জন্য ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর গেজেটের মাধ্যমে কোম্পানি (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন ২০২০ যাতে আরো কয়েকটি বিষয়ের পাশাপাশি এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানি নিবন্ধন চালু করা হয়েছে। যার ফলে এখন থেকে আর শুধু আইন রক্ষার্থে বা নিয়ম রক্ষার্থে কাউকে কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার বানানোর প্রয়োজন নেই। আপনি চাইলে নিজে নিজেই এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানি নিবন্ধন করে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। এবার আসুন আমরা আলোচনা করি এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানি নিবন্ধন করতে গেলে আপনার কি কি প্রয়োজন।



প্রয়োজনের যে তালিকাটি সেটা আসল প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির মতো করেই

  • আপনার জাতীয় পরিচয় পত্র তথা ভোটার আইডি কার্ড লাগবে
  • পাসপোর্ট সাইজের ছবি লাগবে
  • মোবাইল নাম্বার লাগবে
  • ইমেইল এড্রেস লাগবে
  • টিন সার্টিফিকেট লাগবে
  • পাশাপাশি সিগনেচার

এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে যেহেতু আমি এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানির একক মালিক সেই ক্ষেত্রে আমার কোম্পানি চলমান অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হয় বা আমি যদি আমার কোম্পানিটি বিক্রি করতে চাই সে ক্ষেত্রে আমাকে কি করতে হবে?
প্রথমত আপনি যদি আপনার কোম্পানিতে বিক্রি করতে চান সেক্ষেত্রে আপনি কোন একটি ন্যাচারাল পার্সন এর কাছে বিক্রি করতে পারবেন। এক্ষেত্রে উল্লেখ করে রাখা ভালো যে, এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানির নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আপনাকে ন্যাচারাল পার্সন হতে হবে। আমরা জানি আইন অনুসারে ব্যক্তি কিন্তু ২ প্রকার হতে পারে, ন্যাচারাল/প্রাকৃতিক ও আর্টিফিশিয়াল। একটি কোম্পানি নিবন্ধন হয়ে গেলে একটি কোম্পানি নিজেও কিন্তু একজন পার্সন কিন্তু সেটা ন্যাচারাল না সেটা হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল। আপনি চাইলে আপনার কোম্পানিকে কোন একটি আর্টিফিসিয়াল কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে পারবেন না। আপনাকে বিক্রি করতে হবে একজন ন্যাচারাল ব্যক্তির কাছে। আর্টিফিশিয়াল ব্যক্তি কিন্তু এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানি নিবন্ধনও করতে পারবে না। একজন প্রাকৃতিক সত্ত্বা বিশিষ্ট ব্যক্তি নিবন্ধনও করতে পারবে আবার হস্তান্তর করা যাবে প্রাকৃতিক ব্যক্তির কাছে। হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা বিস্তারিত আরেক পর্বে লিখবো।

 

যদি আপনি এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানি নিবন্ধন করেন তাহলে আপনি এককভাবে পুরো শেয়ারের মালিক হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে আপনার মৃত্যু হলে কি হবে?
এক্ষেত্রে একটি বিশিষ্ট কোম্পানি নিবন্ধন করার সময় আপনাকে একজন নমিনি ঠিক করে যেতে হবে। আমরা যেমন ব্যাংকে একাউন্ট খোলার সময় নমিনি ঠিক করে আসি, ঠিক তেমনি আপনাকে এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানি নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও আপনাকে নমিনি ঠিক করে যেতে হবে। কিন্তু ব্যাংকের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পরিচয় আর সম্পর্ক দিলেই হয়, এর আলাদা করে কোনো যোগ্যতার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানি নিবন্ধনে আপনার যে যে যোগ্যতার প্রয়োজন ঠিক তেমনি নমিনির একই ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন। কেননা আপনার অবর্তমানে কোম্পানির পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে সে ক্ষেত্রে নমিনিরও জাতীয় পরিচয় পত্র, ছবি, মোবাইল নাম্বার, ইমেইল, টিন, সিগনেচার ইত্যাদি সংযুক্ত করতে হবে। তবে আপনি চাইলে আপনার নমিনি যেকোনো মুহূর্তে পরিবর্তন করতে পারবেন, যেমনটা ব্যাংকের নমিনি পরিবর্তন করা যায়। আবার একইভাবে নমিনি নিজেও যদি আপত্তি তুলে সেটাও চাইলে উনি আপনার সাথে কথাবার্তা বলার মাধ্যমে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারেন। 

 

আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানি নিবন্ধন করার সময় আপনার কোন প্রকারের ট্রেড লাইসেন্সের প্রয়োজন হবে না বরং আপনার কোম্পানি নিবন্ধন হয়ে যাওয়ার পরে কোম্পানির নামে ট্রেড লাইসেন্স করতে পারবেন। এই ক্ষেত্রে আপনি একটি কোম্পানি দিয়েই অনেকগুলো কাজ করতে পারবেন। অনেকের ধারণা থাকে যে আমাকে ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানি করতে হবে কিনা। আপনি একটি এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে আপনি বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। পাশাপাশি আপনি একজন ব্যক্তি একটি বিশিষ্ট কোম্পানির মালিক থাকা অবস্থায় আপনি চাইলে অন্যান্য প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার হতে পারবেন, তাতে কোনো বাঁধা নেই। কিন্তু একজন ব্যক্তি শুধুমাত্র একটি এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানির মালিকানা থাকতে পারবেন, একাধিক এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানির মালিক হতে পারবেন না। আমরা পরবর্তী কয়েকটি পর্বে step-by-step আলোচনা করবো এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানি নিবন্ধন করতে আপনাকে কত টাকা খরচ বহন করতে হবে, কিভাবে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। আজকে এই পর্বে আমরা শুধুমাত্র এক লাইনে আরেকটা বিষয় বলে যাচ্ছি সেটি হচ্ছে, এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানির পেইড-আপ ক্যাপিটাল ন্যূনতম ২৫ লক্ষ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ কোটি এবং অ্যানুয়াল টার্নওভার ১ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারবে। যদি কোনো কারণে এর চেয়ে বেশি হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে আপনি আপনার এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানিকে পাবলিক অথবা প্রাইভেট কোম্পানিতে কনভার্ট করতে পারবে। এই একটি সুবিধা রয়েছে এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানির ক্ষেত্রে যে, আপনি শুরু করতে পারবেন নিজে নিজে কিন্তু যখনই কোম্পানিটা বড় হতে থাকবে আপনি চাইলেই কোম্পানিকে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি অথবা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত পারবেন। তাছাড়া এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানি থাকা অবস্থাতেই আপনি চাইলে আপনার কোম্পানিতে ম্যানেজার, কর্মচারী, সচিব ইত্যাদি নিয়োগ দিতে পারবেন। তাই ‘যদি কেউ ডাক শুনে না আসে তবে একলা চলো রে’ কেউ যদি আপনার সাথে ব্যবসা করতে উদ্যোগ না নিলে, কেউ যদি এগিয়ে না আসে, সে ক্ষেত্রে আপনি নিজে নিজেই আপনার ব্যবসা শুরু করতে পারেন তার জন্য আপনার কোম্পানিকে এক বিশিষ্ট কোম্পানি হিসেবেই নিবন্ধন করতে পারেন। আমরা আপনার সাথে রয়েছি। পরবর্তী পর্বে আমরা দেখানোর চেষ্টা করব আপনার কত টাকা খরচ হবে এবং কি কি পদক্ষেপ আপনাকে গ্রহণ করতে হবে এক ব্যক্তি বিশিষ্ট কোম্পানি নিবন্ধন করতে হলে। ততক্ষণ পর্যন্ত ভালো থাকুন, LegalFist এর সাথে থাকুন, ধন্যবাদ।

close

Subscribe

Subscribe to get an inbox of our latest blog.