ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের অধিকার

মৃত ভাই-বোনের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার আইন

মৃত ভাইয়ের সম্পত্তি থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে ভাই-বোন কতটুকু সম্পত্তি পায় সেটা নিয়ে আমরা পূর্বেই আমাদের একটি আর্টিকেলে আলোচনা করেছি। আমরা বেশ ব্যাপক হারে সাড়াও পেয়েছি ঐ আর্টিকেলটি থেকে। অনেক ধরনের ভ্রান্ত ধারনা দূর করার পাশাপাশি আমরা ইমেইল এবং ফেসবুকে যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন স্বরূপ বার্তা পেয়েছি। তবে, সেই আর্টিকেলে আমরা ডালাও ভাবে আলোচনা করেছিলাম মৃত ভাইয়ের সম্পত্তিতে ভাই বোনদের উত্তরাধিকার নিয়ে এবং ভুল ভ্রান্তিগুলো দূর করার বিষয়ে। কিন্তু, আজকের আর্টিকেলটিতে আমরা শুধুমাত্র আপন বোন তার মৃত ভাই কিংবা বোনের কাছ থেকে যে সম্পত্তি পেতে পারে সেটা নিয়ে আলোচনা করব। ‘আপন বোনের উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তিতে অধিকার’ এই কথাটা বললেই আমাদের মনে সহজেই যে জিনিসটা চলে আসে সেটা হচ্ছে ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের অধিকার; বিষয়টা কিন্তু তা নয়। এটা বোনের সম্পত্তিতে বোনের অধিকার ও হতে পারে। তাই পাঠক দয়া করে অনুচ্ছেদটি পড়ার সময় সর্বদা মনে রাখবেন যখনই বলা হবে বোনের অধিকার তখনি ধরে নিবেন যে সেটা ভাই কিংবা বোনের সম্পত্তিতে বোনের অধিকার বুঝাচ্ছে; শুধু ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের অধিকার বুঝাচ্ছে না। বোন তো ভাইয়েরও বোন, বোনেরও বোন, তাই না?
এখন কোন ভাই কিংবা বোন মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি উত্তরাধিকারদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। এখন মৃত ভাই কিংবা বোনের যদি বিবাহ না হয়ে থাকে অর্থাৎ যদি অবিবাহিত হয়ে থাকে, তাহলে তো তার ছেলে মেয়ের কাছে সম্পত্তি যাচ্ছে না। উপরে যদি বাবা-মা না থাকে সে ক্ষেত্রে তার সম্পত্তি ভাই-বোনদের দিকে চলে যাবে। এখন যদি মৃত ব্যক্তির ভাই না থাকে অথবা জীবিত না থাকে বা ছিল কিন্তু মারা গেছে, সেই ক্ষেত্রে যদি শুধুমাত্র বোন থেকে থাকে তাহলে বোন উত্তরাধিকারসূত্রে একজন হয়ে থাকলে মোট সম্পত্তির অর্ধেক পাবে কিন্তু বোন যদি একের অধিক হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে মোট সম্পত্তির ২/৩ (তিন ভাগের দুই ভাগ) পাবে। উক্ত তিনভাগের দুইভাগ সম্পত্তি যে কয়জন বোন থাকবে তাদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা হবে। কিন্তু যদি বোনের পাশাপাশি কোন ভাই জীবিত থাকে তাহলে ভাই বোন নিজেদের মধ্যে ২:১ অনুপাতে বণ্টন করে নিবে। বলাবাহুল্য মৃত ব্যক্তির যদি উপরের দিকে বাবা বা দাদা আর নিচের দিকে ছেলে বা ছেলের ছেলে ইত্যাদি থাকে তাহলে বোন উত্তরাধিকারসূত্রে কোন সম্পত্তি পাবে না।

 

আমাদের দেশে বোনের বিয়ের পর বোন অন্যের সংসারে গিয়ে সম্পদের মালিক হওয়ার পর যদি মৃত্যুবরণ করে, তখন তার স্বামীর অবর্তমানে যদি উত্তরাধিকার হিসেবে ছেলে না থাকে তখন কিন্তু তার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়ার সম্পত্তিতে ভাই বোনদের হক তৈরি হয়ে যায়। যদি স্বামী নেই, ছেলে নেই, ভাই নেই, মেয়ে আছে, বোন আছে, তাহলে মেয়েদেরকে দেওয়ার পর কিছু অংশ বোনের কাছে চলে যাবে।



এখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন যে, ভাই এমন কি কোন পরিবার আছে যেখানে কোনো নারীর স্বামী নেই, ছেলে নেই, ভাই নেই, শুধু মেয়ে আছে আর বোন আছে? আমি আপনার সাথে একমত যে, এমন পরিবার খুব বিরল কিন্তু এমন অনেক পরিবার রয়েছে যেখানে পুরুষ উত্তরাধিকারে থাকা সত্ত্বেও যখন ওই নারী মৃত্যুবরণ করে তখন ওই পুরুষ উত্তরাধিকাররা হয়তো জীবিত থাকে না, আমরা জানি যে সাকসেশন যখন চালু বা ওপেন হয়, ঠিক ওই মুহূর্তে যারা জীবিত উত্তরাধিকার রয়েছে তারাই শুধুমাত্র সম্পত্তি পেয়ে থাকে। মৃত ওয়ারিশ কখনোই সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার হিসেবে ভাগ পায় না। এমন ফ্যামিলি পাওয়া কষ্টকর নয়, যেখানে স্বামী মৃত, বাবা মৃত, ভাই মৃত আর ছেলে সন্তান নেই, রয়েছে মেয়ে আর বোন। তবে এটা ঠিক যে আমাদের সমাজে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী স্বামীর থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তির অধিকারী হয় কিন্তু ওই স্ত্রীলোকটি মৃত্যুর সময় তার হয়তো কোন ছেলে সন্তান না থাকার কারণে তার সম্পত্তির একটা অংশ ভাই-বোনদের কাছে চলে যায়। সেক্ষেত্রে তার যদি ভাইও না থেকে থাকে তাহলে বোন উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পেয়ে থাকেন। তবে এক্ষেত্রে সবসময় মাথা রাখতে হবে যে কোন ব্যক্তি মারা যাওয়ার সময় যদি তার বাবা জীবিত থাকে তাহলে ভাই-বোনদের সম্পত্তি পাওয়া আর হচ্ছে না।বাবা শেয়ারার এবং আসাবা উভয় দিক থেকেই সম্পত্তি পাবেন।

ভাইয়ের মৃত্যুর সময় যদি ভাইয়ের কোন ছেলে না থাকে, এক বা একাধিক মেয়ে এবং স্ত্রী থেকে থাকে, উপরের দিকে বাবা না, মা যদি থেকেও থাকে, তাহলেও ঐ মৃত ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের অংশ রয়েছে। অথচ ভাইয়ের মৃত্যুর পর বোন যদি এসে উক্ত সম্পত্তি উত্তরাধিকার দাবী করে বা বিবাহিত বোনের মৃত্যুর পর অন্য কোনো বোন যদি গিয়ে তার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার সূত্রে তার প্রাপ্য অংশটুকু দাবি করে, সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ওইসব বোনকে লোভী হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে। কিন্তু যে অধিকার পবিত্র কোরআন থেকে দেওয়া হয়েছে, সে অধিকারটুকু আদায় করার বেলায় কাউকে লোভী বলে আখ্যায়িত করা আদৌ কতটা যৌক্তিক সেটা আসলে দ্বিতীয়বার চিন্তা করা উচিত। তবে সম্পত্তি পাওয়া মানেই কিন্তু এমন না যে তার সাথে কোন দায়িত্ব থাকে না, একটা নৈতিক দায়িত্ব অবশ্যই থাকে যদি ওই মৃত ভাই বা বোনের কোন সন্তান থেকে থাকে ওই সন্তানের দেখভাল করা,তার খোঁজখবর নেওয়া এতটুকু অন্তত জীবিত যে বোন সম্পত্তি পাচ্ছেন তাদের করা উচিত। সেটা সম্পত্তি পেলেও করা উচিত না পেলেও করা উচিত।

এখনকার সমাজে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টা দেখা যায় সেটা হচ্ছে এক ছেলে এক মেয়ের সংসার। কারণ আমাদের এখন রাষ্ট্রীয় পরিবার পরিকল্পনায় একটি শ্লোগান বেশ জনপ্রিয় যে, ‘দুই সন্তানের বেশি নয় একটি হলে ভালো হয়’-যার কারণে এখনকার বেশিরভাগ পরিবারই দেখা যায় যে, দুই সন্তানের পরিবার। তার মধ্যে বেশিরভাগই দেখা যায় এক ছেলে, এক মেয়ে। এখন ভবিষ্যতে এই এক ভাই, এক বোনের মধ্যে ভাই মারা যাওয়ার পরে তার যদি কোন ছেলে সন্তান না থাকে, তার স্ত্রী এবং তার মেয়েদেরকে দেওয়ার পরে যে অবশিষ্ট সম্পর্ক থাকে, সেটি তার বোনের কাছে চলে যাবে। ভাই হোক আর বোন, যদি ছেলে সন্তান না থাকে আর বাবা না থাকে, তাহলে বোনের কাছে সম্পত্তি চলে আসার সম্ভাবনা খুবই বেশী। তাই, কোরআনের আইন মেনে বোনদেরকে তাদের হক দেওয়া উচিত আর শুধু ভাই বা বোনের মৃত্যুতে তাদের হক নয়, বোনরা মেয়ে হিসেবে বাবা মায়ের কাছ থেকে যে হক পাবে, সেটাকেও খুব সহজেই তাদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া উচিত। মায়ের জাতিকে দুর্বল ভেবে তাদের হক মেরে দিলে, আল্লাহ্‌ একজনের কাছে আপনার শক্তি কিন্তু কিছুই না; দিন শেষে সেই কবরেই ফিরতে হবে। তাই, হক পরিশোধে আমরা সদাসর্বদা কোরআনের আইন মেনে চলবো, ইনশাআল্লাহ।

close

Subscribe

Subscribe to get an inbox of our latest blog.