জমি উচ্ছেদ আইন

উচ্ছেদ মামলা: কখন কেন কিভাবে?

জমি-জমার আইন দেওয়ানি আইন

টাইটানিক সিনেমায় লিওনার্দো ডিকেপ্রিও জাহাজের একদম অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে একটা ডায়লগ দিয়েছিলেন যে, খেয়াল আছে? – “I’m the king of the world”. এটা হচ্ছে একটা কথার কথা। আপনার মনোজগতের যে রাজ্য, সেই রাজ্যের রাজা আপনি; কিন্তু, সেটা কখনোই বাস্তব জগতে কোন প্রভাব বিস্তার করবে না। এটা কেবলই, রূপক। তেমনই জমাজমির ক্ষেত্রেও আপনি যদি শুধু রূপক মালিক হয়ে থাকেন, তাহলে সেটা শুধু নিজের উত্তরাধিকারদের কাছে গল্প বলার জন্যই তুলে রাখতে হবে যে, আমার অমুক জায়গা ছিল, তোমুক বাড়ি ছিল, সব ঐ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জোর করে নিয়ে গেছে।

তাই, এসব রূপক মালিকানা বাদ দিয়ে বাস্তবে মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। আর এই বাস্তব মালিকানা নিশ্চিত করতে হলে আগে জানতে হবে, জমির মালিকানা কি কি উপায়ে নিশ্চিত করা যায়। সাধারণত, জমির মালিকানা থাকে দুইভাবে। এক, জমির কাগজপত্র (দলিল, খতিয়ান ইত্যাদি), দুই, দখল। আপনি ক্রয় সূত্রে বা উত্তরাধিকার সূত্রে যে জমির মালিক, সেই জমির শুধু মাত্র কাগজপত্রেই মালিকানা থাকবে, তা কিন্তু নয়। বরং, সরেজমিনে দখল নিশ্চিত করার মাধ্যমেই জমির প্রকৃত মালিকানা সুনিশ্চিত করতে হবে।

আমরা যে জমির মালিক সেই জমি আমরা দখলে রাখার অধিকারী। এই জমি অন্য কেউ দখল নিতে পারবে না। যদি কারও দখলে থাকে তবে আদালতে মামলা করে দখল পুনরুদ্ধার করা যায়। কাউকে আইনানুগ ভাবে কোন জমিতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দখল দিলে সেই নির্দিষ্ট সময় পরে দখল বুঝিয়ে না দিলে বেআইনিভাবে শক্তি প্রয়োগ করে দখল উদ্ধার করা যায় না। এক্ষেত্রেও মামলা করে দখল উদ্ধার করতে হয়। এই মামলাকে উচ্ছেদের মামলা বলে। ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারায় জজ কোর্টে এই মামলা করা যায়। যে জমি নিয়ে বিরোধ, সেই জমি যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলার কোন আদালতে মামলা হবে তা নির্ভর করবে জমির দামের উপর। জমির দাম দুই লক্ষ টাকা পর্যন্ত হলে উক্ত জেলার সহকারী জজ আদালতে মামলা করতে হবে। দুই লক্ষ টাকার বেশি তবে অনধিক চার লক্ষ টাকা পর্যন্ত হলে সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে। এর চেয়ে বেশি দামের জমির ক্ষেত্রে যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা করতে হয়। সরকার জাতীয় সংসদের মাধ্যমে দেওয়ানি আইন সংশোধন করে জজ সাহেবদের এই ক্ষমতা কম-বেশি করতে পারে। সাধারণত লোকে কোর্ট ফি ফাঁকি দেয়ার জন্য জমির দাম কম দেখায়। জমির দামের উপর নির্ভর করে কোর্ট ফি হিসেবে কোর্ট ফি স্ট্যাম্প জমা দিতে হয়।



উচ্ছেদের মামলায় দখলের জন্যও আবেদন করতে হয়। দখল পুনরুদ্ধারের মামলা করা হলেও এই মামলায় স্বত্বের প্রমাণ করতে হয়। যিনি দখলে থাকেন তাকেই প্রাথমিকভাবে মালিক বলে অনুমান করা হয়। যদি কেউ বিপরীত কিছু বলতে চায়, তবে তাকে তা প্রমাণ করতে হয়। এই কারণে দখল পুনরুদ্ধারের মামলা বাদীকে প্রথমে স্বত্ব প্রমাণ করতে হয়। প্রথমে শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা করার পর আলাদাভাবে দখল দেওয়ার জন্য মামলা করা যায় না। একই কারণে বার বার মামলা করলে মানুষ হয়রানী হবে, মামলার সংখ্যা বাড়বে তাই আইনের এই নীতি; দোবারা দোষে দুষ্ট হবে। আলাদাভাবে মামলা করলে অযথা মামলার সংখ্যা বাড়ে, সময়ও নষ্ট হয়। এই আইনের মামলায় স্বত্বের প্রমাণ করতে হয়। বেদখলের ১২ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার ৩ বছরের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হয়। ১২ বছর অতিক্রান্ত হলে তামাদির কারণে আর মামলা করা যায় না। মামলা করলেও তা তামাদির কারণে খারিজ হয়ে যাবে। তবে কেউ যদি যথোপযুক্ত কারণ দেখিয়ে আদালতকে মামলা দায়েরের বিলম্ব সম্বন্ধে সন্তুষ্ট করতে পারে, তখন আদালত চাইলে মামলা আমলে নিতে পারেন। কোন কোন ক্ষেত্রে মামলা দায়েরের তামাদি মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পর মামলা করলে মামলা খারিজ হবে না, সেটি নিয়ে অন্য একটি আর্টিকেলে পরিপূর্ণ ভাবে আলোচনা করবো। যাই হোক, দখল পুনরুদ্ধারের মামলার ক্ষেত্রে ১২ বছরের মধ্যে বেদখল করার বিষয়টা প্রমাণ করতে হয়। স্বত্বহীন ব্যক্তির ১২ বছরের বেশি সময়ের জন্য কোন জমি দখলে রাখলে মালিকানার দাবি করতে পারেন। সরকারি জমির জন্য এই সময় ৬০ বছর। এজন্য মামলা করে মালিকানা পেতে হয়। এই মামলাকে বিরুদ্ধ দখলের মামলা বলে।

দেওয়ানী মামলা ছাড়াও রয়েছে ফৌজদারি প্রতিকার। আপনাকে আপনার জমি থেকে কেউ জোর করে বেদখল করলে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারায় মামলা করে জমির দখল ফেরত পেতে পারেন। এ জন্য বেদখল হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে মামলা করতে হয়। ৬০ দিন পর মামলা করলে পুনঃদখল দিতে পারে না। ১৪৪ ধারার মামলা করলে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত একই আইনের ১৪৫ ধারায় জমি ক্রোক করতে পারে। ফৌজদারি আদালতে মামলা করলেও দেওয়ানি আদালতের দরজা খোলা থাকে। দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে কোন বাধা নেই। মারপিট বা শান্তি ভঙ্গের আশংকা থাকলে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে এই মামলা করে রাখা ভাল। এই মামলা করা হলেও দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে কোন বাধা নেই।

কেউ আমাদেরকে জমি হতে বেদখল করলে আমরা বলপ্রয়োগ না করে প্রথমত, ঘরোয়া পরিবেশে দুই পক্ষ বসে সমাধানের চেষ্টা করুন, প্রয়োজনে সালিশি পরিষদের মাধ্যমে মীমাংসা করার চেষ্টা করবো। কিন্তু, কোন ভাবেই কোন সমাধান না হলে সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে আদালতের মাধ্যমে দখল উদ্ধার করব; তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে তামাদির মেয়াদ শেষ না হয়ে যায়।

close

Subscribe

Subscribe to get an inbox of our latest blog.