সরকার জমি বেদখল করলে

স্থাবর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার: সরকারের বিরুদ্ধে মামলা

জমি-জমার আইন

সাধারণত আমাদের দেশে যে মামলা মোকদ্দমাগুলো হয়ে থাকে তার মধ্যে সিংহভাগ আরো স্পষ্ট করে বললে বলা যায় চার ভাগের তিন ভাগ বা তারও অধিক মামলা হয়ে থাকে সাধারণত জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে। বাকি যে মামলাগুলো হয়ে থাকে তার মধ্যেও ক্রিমিনাল মামলার সংখ্যাই বেশী যেগুলোর একটি বড় অংশের উৎপত্তিস্থল আবার জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ থেকে। এই জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ গুলো সাধারণত আমরা দেখে থাকি পরিবারের মধ্যে ভাইয়ে ভাইয়ে, চাচা ভাতিজা বা প্রতিবেশীদের সাথে সংঘটিত হয়ে থাকে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই বিরোধ গুলো জনগণের সাথে সরকারের হয়ে থাকে। কারণ আমরা জানি, সরকার চাইলে আপনাকে আপনার স্থাবর সম্পত্তি থেকে অর্থাৎ আপনার জমি থেকে আপনাকে উচ্ছেদ করতে পারে। এর আগে আমরা সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ এবং ৯ ধারার  মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে, কেউ যদি আপনাকে আপনার জমি থেকে উচ্ছেদ বা দখলচ্যুত বা বেদখল করে সেক্ষেত্রে আপনি কিভাবে আপনার দখল পুনরুদ্ধার করতে পারবেন। পাশাপাশি এও দেখেছি যে আপনি আপনার জমির যে সমস্ত কাগজপত্র রয়েছে সেই কাগজপত্র সংক্রান্ত কোনো জটিলতা বা ভুলত্রুটি থাকলে সেটা কিভাবে সংশোধন করবেন। তবে উভয় ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি যে, আপনার প্রতিপক্ষ হচ্ছে আপনার মত একজন সাধারণ নাগরিক। কিন্তু যখন আপনার প্রতিপক্ষ থাকবে স্বয়ং সরকার নিজে অর্থাৎ সরকার আপনাকে আপনার জমি থেকে উচ্ছেদ করেছে বা কাগজপত্র সংক্রান্ত জটিলতা গুলো সরকারের বিরুদ্ধে, সেই ক্ষেত্রে আপনি কিভাবে আপনার জমি পুনরুদ্ধার করবেন, আজকের অনুচ্ছেদে আমরা সেই বিষয়ে জানার চেষ্টা করব।

 

প্রথমত, সরকার কেন আপনার জমি দখল করবে বা আপনাকে আপনার জন্য থেকে কেন উচ্ছেদ করবে, এই বিষয়ে সঠিক ধারণা রাখা প্রয়োজন। সাধারণত সরকার সরকারি কোন কাজের জন্য যেমন সচরাচর সবচেয়ে প্রচলিত দৃশ্যমান যে কারণটি রয়েছে সেটি হচ্ছে সরকারি রাস্তা। সরকারি রাস্তা তৈরি করার জন্য সরকার সময়ে সময়ে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে জমি নিয়ে থাকে, সেটিকে আমরা অধিগ্রহণ হিসেবে জানি। সেটা ছাড়াও আরও বিভিন্ন ধরনের সরকারি কাজের জন্য আপনার আমার জমি সরকার নিতে পারে। সরকার সরকারি কাজের জন্য যে জমিগুলো জনগণের কাছ থেকে নিয়ে থাকে অর্থাৎ অধিগ্রহণ করে থাকে, সেটার জন্য সরকার ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকে। অধিগ্রহণ এবং এর বিপরীতে ক্ষতিপূরণ কিভাবে দেয় সেটি সম্বন্ধে আমরা স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন ২০১৭ এর মাধ্যমে জানতে পারবো। ভবিষ্যতে আমরা অন্য একটি অণুচ্ছেদের মাধ্যমে এই স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন সংক্রান্ত বিষয়ে বিশদ জানার চেষ্টা করব। আপাতত এই অনুচ্ছেদে আমরা অধিগ্রহণ নয় কিন্তু সরকার অন্য কোন উপায়ে আপনাকে আপনার জমি থেকে বেদখল করলে আপনি কি করবেন সেই সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করবো।

শুরুতেই আরেকটি কথা বলে রাখি, সরকার অবৈধ উপায়ে বা আইন বহির্ভূত কোনো পন্থায় আপনাকে আপনার জমি হতে উচ্ছেদ বা দখলচ্যুত বা বেদখল করবে না, সরকার অবশ্যই আগে থেকেই জানিয়ে রাখবে যে জমিটি সরকারের জমি এবং আপনি ওই জমিতে অবৈধভাবে বসতি স্থাপন করেছেন বা দখল করে বসে আছেন। সে ক্ষেত্রে সরকারি জমি ছেড়ে দেওয়ার কথা সরকার যেকোনো ভাবে জানাবে।



এখন যদি সরকার আপনাকে আপনার জমি থেকে বেদখল করে কিন্তু আপনি আপনার জমির বৈধ মালিক হয়ে থাকেন, সে ক্ষেত্রে আপনি কখনও সরকারের বিরুদ্ধে দখল পুনরুদ্ধার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারায় মামলা করতে পারবেন না। কেননা, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারাতেই স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, সরকারের বিরুদ্ধে এই ধারায় মামলা করা যাবে না। এই নির্দেশনা থেকে একটা জিনিস বোঝা যায় যে, সরকার সরকারের জায়গা ব্যতীত অন্য কোন সাধারণ জনগণের জায়গায় অবৈধভাবে দখল গ্রহণ করবেন না, সরকার কেবল নিজের জমি দখল করবে। সাধারণত খাস জমি গুলো হচ্ছে সরকারের, সরকারের নামে খতিয়ানও রয়েছে। সকল জায়গার ১ নং খতিয়ানের জমি গুলোর মালিক সরকার। আমরা জানি যে জেলা প্রশাসক বা ডিসি ১ নং খতিয়ানের মালিক। ওইগুলো হচ্ছে সরকারি জমি। এখন আপনি ১ নং খতিয়ানভুক্ত কোন জমির দখলে থাকেন তাহলে আপনিই ঐ জমিতে অবৈধ দখলদার, সরকার নয়। কিন্তু কোন কারণে যদি আপনার মনে হয় যে ওই জমিটি আপনার এবং আপনার বৈধতার রয়েছে ওই জমির উপরে, তাহলে আপনাকে মামলা করতে হবে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারায়। বলাবাহুল্য, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারায় মামলা করার সময় ৪২ ধারা সংযুক্ত করে স্বত্ব ও দখলের মামলা দায়ের করতে হবে।

 

আবার, সরকার যদি কখনো ভুল তথ্যের ভিত্তিতে অথবা কোন ত্রুটির উপর ভিত্তি করে যেমন খতিয়ানে আপনার জমি ভুলে সরকারের নামে উঠে গেলে অর্থাৎ ১ নং খতিয়ানে উঠে গেলে অথবা কর অনেক বছর যাবত পরিশোধ করা না হয়ে থাকলে অথবা অন্য যে কোনো কারণে যদি আপনার জমি সরকার নিজের জমি মনে করে সরকার দখল বুঝে নেয় সেক্ষেত্রে আপনার উচিত হবে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারা অনুসারে মামলা করা এবং আপনাকে আপনার স্বত্ব এবং দক্ষতা প্রমাণের ভিত্তিতে দেওয়ানি আদালতে মামলা করে নিজের জমি ফেরত পেতে পারবেন।

তবে, একটা কথা, সাধারণত ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে খতিয়ান সংশোধনের মামলা করা হয়। এখন খতিয়ানে যদি আপনার নামের স্থলে আমার নামে উঠে যায় সে ক্ষেত্রে আমাকে বিবাদী করে খতিয়ান সংশোধনের মামলা করে খতিয়ান সংশোধন করতে পারবেন। কিন্তু খতিয়ানে যদি সরকারের নাম উঠে যায় আপনার নামের পরিবর্তে, সেক্ষেত্রে আপনাকে সরকারকে বিবাদী করে খতিয়ান সংশোধনের মামলা ট্রাইব্যুনালে দায়ের করতে হবে। কিন্তু ট্রাইব্যুনালে মামলা গ্রহণ না করলে (কেন ট্রাইব্যুনাল মামলা গ্রহণ করবে না তা ‘দখল পুনরুদ্ধার: স্বত্ব ও ঘোষণার মামলা’ অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে, দেখে নিন) সেক্ষেত্রে আপনাকে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারা মামলা করতে হবে। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারায় মামলা করতে হলে আপনি আপনার জমির দখল বা স্বত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে যেদিন থেকে বেদখল বা স্বত্বহীন, সেদিন থেকে ১২ বছরের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে।

অনেকেই মনে করেন, সরকারের বিরুদ্ধে মামলা, ওরে বাবা, এও সম্ভব? নাকি আপনি বিরোধী দলের কেউ? আসলে বিভিন্ন বিষয়সহ স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত বিষয়েও সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। সরকার নিজেও পরিচালিত হচ্ছে আমাদের মত মানুষ দ্বারা, সেখানেও যদি কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকে যার ফলে আপনার জমির দখল সরকারের কাছে চলে যায় বা যাওয়ার উপক্রম হয়, তাহলে আপনাকে উপরোক্ত উপায়ে মামলা করে নিজের জমির দখল পুনরুদ্ধার করতে হবে।

close

Subscribe

Subscribe to get an inbox of our latest blog.