বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল

বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের গঠন

বিবিধ আইন

আমরা ছোটবেলায় যখন আমাদের বন্ধু বান্ধব বা কোন আত্মীয় স্বজন বা প্রতিবেশীর সাথে কোন অন্যায় করতাম, তখন তারা আমাদের অভিভাবকদের কাছে আমাদের বিরুদ্ধে নালিশ বা অভিযোগ নিয়ে আসা হতো। অভিভাবকরা তখন সব কথা শুনে আমাদের দোষ খুঁজে পেতেন, তখন আমাদের শাসন করতেন। আর যদি দেখা যায় যে আমাদের দোষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন বরং উল্টো যে অভিযোগ বা নালিশ নিয়ে এসেছিল তাকে শাসিয়ে দিতেন।
এটি যদিও বেশীরভাগ ক্ষেত্রে প্রচলিত বাংলাদেশের পারিবারিক শাসনের চিত্র, কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। অনেক পরিবার আছে সন্তান অন্যায় করুক বা না করুক, তার নামে নালিশ আসলেই হলো; সন্তানকে আত্নপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই বরং নালিশ আসলো কেন, এজন্যই একচেটিয়া উত্তম-মধ্যম দেওয়া হবে তাকে। আবার তার ঠিক উল্টো চিত্রও দেখা যায়, সন্তান অন্যায় করে আসলেও নিজের সন্তানের স্বপক্ষে সাফাই গেয়ে উল্টো নালিশকারীকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়বেন, যার জন্য ঐ প্রবাদটির প্রচলন আছে আজও, ‘চোরের মায়ের বড় গলা’।
যাই হোক, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল হচ্ছে বাংলাদেশে থাকা সকল আইনজীবীদের অভিভাবক। তাই, কোন আইনজীবীর বিরুদ্ধে যদি কারো কোন অভিযোগ থাকে, তিনি সেই অভিযোগ দায়ের করবেন আইনজীবীদের অভিভাবক তথা বার কাউন্সিল বরাবর। বার কাউন্সিল অর্ডারের ৩২(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনজীবীর বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণ বা অন্য যেকোনো অসদাচরণের অভিযোগ প্রথমে বার কাউন্সিলের নিকট দায়ের করবে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে পারে কারা?
আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে পারেনঃ

  • আদালত,
  • স্বয়ং বার কাউন্সিল বা
  • অন্য যেকোনো ব্যক্তি।

 

আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ কিভাবে দায়ের করতে হয়?
বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাক্টিশনারস এবং বার কাউন্সিল রুলস, ১৯৭২ এর ৪১ বিধি অনুযায়ী, আইনজীবীর বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণ বা অন্য যেকোনো অসদাচরণের অভিযোগের সাথে নিম্নলিখিত বিষয় যুক্ত করতে হবেঃ

  • আইনজীবীর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের বিবরণ,
  • অভিযোগের সাথে সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র,
  • যদি অভিযোগকারী আদালত না হয় বা সরকারী কর্মকর্তা তার অফিসিয়াল দায়িত্বে অভিযোগ দায়ের না করে, তাহলে অভিযোগের সাথে অভিযোগকারীকে এফিডেভিট বা হলফনামা জমা দিতে হবে। তবে বার কাউন্সিল চাইলে উক্ত এফিডেভিট বা হলফনামা দাখিল করা হতে অব্যাহতিও দিতে পারেন।
  • বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাক্টিশনারস এবং বার কাউন্সিল রুলস, ১৯৭২ এর ৪১ক বিধি অনুযায়ী, বার কাউন্সিলে কোন আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করতে হলে ১০০০ টাকা ফি জমা দিতে হয়।

 

আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পর কি হয়?
আইনজীবীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ দায়ের করা হলে, বার কাউন্সিল অর্ডারের ৩২ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বার কাউন্সিল উক্ত অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
কিন্তু আইনজীবীর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ যদি বার কাউন্সিল প্রত্যাখ্যান না করে থাকেন, তখন বার কাউন্সিল অর্ডারের ৩৩ অনুচ্ছেদের অধীন গঠিত ‘বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালে’র নিকট নিষ্পত্তির জন্য পাঠাতে পারেন।
এবার, আসুন কাঙ্ক্ষিত বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের কাছে। বার কাউন্সিল অর্ডারের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বার কাউন্সিল এক বা একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারে।

বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য কতজন?
বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য সংখ্যা ৩ জন।

এই ৩ জন কারা?
বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের ৩ জন সদস্য হবেন, বার কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্য হতে বার কাউন্সিল কর্তৃক মনোনীত ২ জন সদস্য এবং আইনজীবীদের মধ্য হতে একজন নিয়ে ‘বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল’ গঠিত হবে। তবে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এটর্নি জেনারেল বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য হতে পারবেন না।

বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান কে?
বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের ৩ জন সদস্য মধ্যে যিনি প্রবীণ, তিনিই বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হবে।

বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের সচিব কে হবেন?
বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাক্টিশনারস এবং বার কাউন্সিল রুলস, ১৯৭২ এর ৪৯ বিধি অনুযায়ী, বার কাউন্সিলের সচিব পদাধিকার বলে বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের সচিব হবেন এবং ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ইস্যুকৃত প্রত্যেকটি নোটিশ জারি করবেন।

বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল কিভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করে?
বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাকটিশনারস এবং বার কাউন্সিল রুলস, ১৯৭২ এর ৪৫ বিধি অনুযায়ী, একজন আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাপ্তির পর, বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল শুনানির জন্য দিন ধার্য করবে, তবে সেটি কোনমতেই অভিযোগ প্রাপ্তির ২১ দিনের মধ্যে না। অর্থাৎ, আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাপ্তি এবং শুনানির মধ্যে অন্তত ২১ দিনের ব্যবধান থাকবে। এই সময়ের মধ্যে বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্ত আইনজীবীকে একটি নোটিশ দিবেন।
বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাকটিশনারস এবং বার কাউন্সিল রুলস, ১৯৭২ এর ৪৬ বিধি অনুযায়ী, নোটিশ পাওয়ার পর আইনজীবী শুনানির জন্য নির্ধারিত তারিখের সর্বনিম্ন ৭ দিন পূর্বে জবাবের ২ কপি বার কাউন্সিলের সচিবের নিকট জমা দিবেন। শুনানির ২ দিন পূর্বে সচিব উক্ত কপি এটর্নি জেনারেল এবং অভিযোগকারীর নিকট অর্পণ করবেন।

ট্রাইব্যুনালে আইনজীবী দোষী সাব্যস্ত হলে?
বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালে কোন আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হলে এবং সেই অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাওয়া গেলে উক্ত আইনজীবীকে ২ ধরনের সাজা প্রদান করা যেতে পারে। Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order 1972 এর ৩২ (১) অণুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোন আইনজীবী পেশাগত অসদাচরণের জন্য দোষী প্রমাণিত হলে,

  • আইনজীবীকে কঠোর তিরস্কার করা যেতে পারে, অথবা
  • আইনজীবীকে আইন পেশা হতে সাময়িক বরখাস্ত বা অপসারণ করা যেতে পারে।

ট্রাইব্যুনালে আইনজীবী নির্দোষ প্রমাণিত হলে?
বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার এবং বার কাউন্সিল অর্ডার ১৯৭২ এর ৩৪(৪) অণুচ্ছেদ অনুযায়ী, বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালে কোন আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হলে এবং অনুসন্ধান শেষে সেই অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাওয়া না গেলে, উক্ত আইনজীবীর বিরুদ্ধে করা অভিযোগটি খারিজ করে দেওয়া যেতে পারে। আজকে এই পর্যন্তই, পরবর্তী পর্বে আমরা জানার চেষ্টা করবো, বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের সামগ্রিক ক্ষমতা এবং ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার সম্বন্ধে।

close

Subscribe

Subscribe to get an inbox of our latest blog.