মামলার বিকল্প হিসেবে ADR কেন প্রয়োজন?

LEGAL FIST

সাধারণত যেকোনো আইনানুগ বিরোধ দেখা দিলেই আমরা আমাদের প্রতিপক্ষকে বলি যে, “I’ll see you in court”. এই বলে আমরা আদালতের দ্বারস্থ হই। এরপর থেকে শুরু হয় দু’পক্ষের আইনি লড়াই; যা আর্থিক, মানসিক, শারীরিক অবক্ষয় ঘটিয়ে কালের পর কাল ক্ষেপণ করে শেষে চিন্তা করতে বসি আদৌ কি কোন ফায়দা হলো মামলা করে নাকি দু’পক্ষ বসে সমাধান করতে পারতাম? এতে কি সম্পর্কটাও ঠিক থাকতো না? এ বিষয় নিয়েই আজকের আলোচনা।

Subscribe

Subscribe to get an inbox of our latest blog.

এই আর্টিকেলটি শেয়ার করুন

০০:০০ – ০১:০০ দুই ভাই। তাদের বাবা মারা যাওয়ার পরে বাবার রেখে যাওয়া সকল সম্পত্তিতে তারা দুইজন সমানভাবে অংশীদার হয়। ভিটে বাড়ি ছিল, কৃষি জমি ছিল, পাশাপাশি তাদের জন্য একটা বাঁশ ঝাড় ছিল। গ্রাম অঞ্চলে যারা থাকেন তারা মোটামুটি বাঁশ ঝাড় চিনেন, শহর অঞ্চলে যারা থাকেন তারাও অন্তত বাঁশের শব্দটার সাথে বা বাঁশের সাথে পরিচিত। বাঁশ ঝাড় হচ্ছে গিয়ে একটা নির্দিষ্ট এরিয়া নিয়ে একটার পর একটা উঠতে থাকে বাঁশ, অটোমেটিকালি। এই বাঁশ কি কাজে আসে? বাঁশের পাতাগুলো রান্নার কাজে আসে আর বাঁশের যে ব্যাপারটা আছে সেটা ঘরের বিভিন্ন কাজে আসতে পারে। তারপর হচ্ছে কোন একটা জায়গায় আপনার কিছু একটা ফিলারের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করা যেতে পারে।

০১:০১ – ০২:০০ এখন এই বাঁশ ঝাড়ের বাঁশের পাতা কুড়ানো নিয়ে, যেহেতু রান্নার কাজে এটা ব্যবহার করা হয়, দুই ভাইয়ের স্ত্রীদের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঝগড়া হয়। এ বলে যে ও বেশি কুড়িয়ে নিয়ে গেছে, ও বলে যে আমি সকাল সকাল কুড়িয়ে নিয়ে গেছি। একেকটা একেক ধরনের কথা বলে এটা নিয়ে প্রতিনিয়ত তাদের মধ্যে ঝগড়া লেগে থাকে। তো এই ঝগড়ার পরিপ্রেক্ষিতে দুই ভাই সিদ্ধান্ত নিল যে সবকিছু তো ভাগ হয়ে গেছে আমাদের, ভিটে বাড়ি ভাগ হলো, কৃষি জমি ভাগ হলো, তাহলে এই বাঁশ ঝাড়টাও ভাগ করতে হবে। এখন এই ভাগ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। কারণ বাঁশ ঝাড় যেহেতু একটা স্পেসিফিক আলাদা করার মত কিছু, পুরো একটা… একটা কলা গাছ বা বিভিন্ন গাছ যেগুলো একটার সাথে একটা অনেকগুলো কানেক্টেড থাকে, এগুলো তো আসলে ভাগ করতে গেলে পুরোটাকেই, পুরো বাঁশ ঝাড়টাকে আলাদা করতে হবে। এখন বাঁশ ঝাড় যদি ওরা কেটে আলাদা করে ফেলে তখন আর বাঁশ ঝাড়ের অস্তিত্ব থাকে না। তো ওরা সিদ্ধান্ত নিল যে বাঁশ ঝাড় বাঁশ ঝাড়ের জায়গায় থাকবে কিন্তু আমরা এটাকে ভাগ করব। এখন ভাগ করতে গেলে আবার তাদের দুইজনের মধ্যে কথা হল যে এক কাজ করি আমরা ভাগ না করে, তোমাকে আমি একটা সাইড থেকে ছেড়ে দিই আর তুমি আমাকে একটা সাইড থেকে ছেড়ে দাও। এটাও তাদের সমাধান হলো না।

০২:০১ – ০৩:০০ পরে একটা সময় এক বড় ভাই দাবি করল যে আমি যেহেতু বড় এই বাঁশ ঝাড়টা আমার। তুমি পাবাই না। ছোট ভাই বলল যে না, বড় ভাই আপনার জন্য বাবা মা অনেক কিছু করেছেন, আমার জন্য কিছুই তেমন একটা করতে পারে নাই, বাঁশ ঝাড় আমার। দুইজনে এই বাঁশ ঝাড় নিয়ে এবার মারামারি লেগে গেল। প্রথমে ছিল স্ত্রীদের মধ্যে গণ্ডগোল, পরবর্তীতে সেটা চলে আসছে নিজেদের ভাইদের মধ্যে। গণ্ডগোলের এক পর্যায়ে তারা সিদ্ধান্ত নিল যে এটা নিয়ে কোর্টে মামলা করবে। যে বাঁশ ঝাড়টা কার। কোর্টে মামলা করে ফেলল ওরা। মামলা করার পরে এই কোর্টে প্রতিনিয়ত তারা যায়, হাজিরা দেয়, আরজি দাখিল করল, লিখিত জবাব দিল। তারপরে আস্তে আস্তে কোর্টের যে প্রসিডিউর সেটা আস্তে আস্তে অনুসরণ করতে থাকল। করতে করতে কোর্টে তো একটা খরচ আছে, মামলা পরিচালনার যে একটা খরচ আছে। তো এই খরচ দিতে গিয়ে… দিতে স্টার্ট করল বড় ভাই ও ছোট ভাই দুজনেই দিতে থাকল। তাদের মধ্যে যে সেভিংস ছিল সে সেভিংস মোটামুটি শেষ করে ফেলল মামলা চালাতে চালাতে।

০৩:০১ – ০৪:০০ কারণ দেওয়ানি (Civil) মামলা চলতে অনেক সময় লাগে এটা আমরা জানি। কারণ দুই ভাই যেহেতু একই বাবার সন্তান সেক্ষেত্রে তাদের বাবা ছিল এই বাঁশ ঝাড়টার একক মালিক। এখন তাদের মধ্যে কাকে দেওয়া যেতে পারে এটা নিয়ে কোর্ট একটু সময় নিচ্ছে, ওদের দুই পক্ষের কথাবার্তা শুনতেছে, দালিলিক প্রমাণগুলা দেখতেছে। এবং তাদের ইন্টারনাল যে ঝগড়াগুলো আছে সেগুলোও শুনতেছে। এদিক দিয়ে প্রতিনিয়ত দুইজনই দুই উকিলকে টাকা দিতে হয়, মুহুরিকে টাকা দেওয়া লাগে, একে টাকা দেওয়া লাগে, ওকে টাকা দেওয়া লাগে, সাক্ষীদেরকে উপস্থাপন করা লাগে কোর্টে। এই যাওয়া আসা করতে করতে তাদের সেভিংস যেমন শেষ হয়ে গেল, আস্তে আস্তে ওরা কৃষি জমি বিক্রি করে ফেলল। বাহিরে যে জমিগুলো ছিল। জমি বিক্রি করে হলেও মামলা চালাবে, ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা জিততেই হবে, বাঁশ ঝাড় আমাকে পেতেই হবে।

০৪:০১ – ০৫:০০ যখন কৃষি জমি শেষ, বিক্রি করে মামলা চালানো শুরু করল, একটা সময় এই টাকাও শেষ হয়ে গেল। তখন তারা সিদ্ধান্ত নিল ভিটে বাড়িটা আছে, ওই বাড়িটা বিক্রি করবে। করে মামলা পরিচালনা করতে হবে। তখন কেউ একজন তাদেরকে বুদ্ধি দিল যে, বাঁশ ঝাড়ের জন্য তোমরা কৃষি জমি হারাইছ, এখন ভিটে বাড়িও হারাবা? শুধু একে অন্যর বিরুদ্ধে মামলা করার কারণে? দুইজন দুইজনকে যদি একটু ছাড় দিতা? যদি এমনও করতা শনিবারে এ বাঁশ ঝাড়ের পাতা নিবে, রবিবারে ও নিবে। একদিন এ নিবে, একদিন ও নিবে। এই সাধারণ একটা সমাধানও যদি তোমরা অবলম্বন করতা এবং বাঁশ যা হবে একজন এ নিবে, একজন ও নিবে। তাহলে কিন্তু তোমাদেরকে আজকে এত হাঙ্গামা দাঙ্গা-হাঙ্গামার প্রয়োজন ছিল না। তোমরা প্রথমে তোমাদের সেভিংস নষ্ট করলা, কৃষি জমি নষ্ট করলা, এখন আসছ তোমরা ভিটে বাড়ি বিক্রি করতে। এই যে একটা উপদেশ দেওয়ার বিষয়টা, এই উপদেশ দেওয়ার মানসিকতার লোকদের অভাব আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি। এবং আমরা এখানে শুধুমাত্র দেখলাম আর্থিক যে ক্ষতিটা সেটা।

০৫:০১ – ০৬:০০ দুই ভাইয়ের মধ্যে যে সারা জীবনের জন্য সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এটা কিন্তু আমরা অনেকেই খেয়াল করছি না। সামান্য একটা বাঁশ ঝাড়ের বাঁশকে কেন্দ্র করে তাদের কৃষি জমি হারাতে হল, সেভিংস হারাতে হল এবং তারা ভিটে বাড়ি হারাতে লাগল। অনেকে আছে ওই সময়ও শুভবুদ্ধির উদয় হয় না। তাদের একটা জিদ চলে আসে মাথার মধ্যে যে আমাকে জিততেই হবে মামলা। এই জিদাজিদির মধ্যে গিয়ে মানুষ কি করে সম্পর্ক তো হারায়, আর্থিক ক্ষতিও হয়, দিনশেষে তার নিজের আসলে অস্তিত্বটাই হারিয়ে ফেলে। এই কারণেই আমাদের আদালতে বা আমাদের যে আইন অঙ্গন আছে ওইখানে এডিআর (ADR), অল্টারনেটিভ ডিস্পিউট রেজুলেশন (Alternative Dispute Resolution), এটাকে ধীরে ধীরে প্রমোট করা হচ্ছে। অলরেডি সিভিল মামলাগুলোতে এটাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তিন মাসেরও বেশি সময় দেওয়া হয় একটা মামলাকে মেডিয়েশন (Mediation) করার জন্য। যাতে দুই পক্ষ বসে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে মামলাটা নিষ্পত্তি করে। ক্রিমিনাল মামলার ক্ষেত্রেও সেটাকে, কিছু মামলা রয়েছে, প্রত্যেকটা মামলা না, কিছু মামলা রয়েছে আপোষযোগ্য যেগুলাকে আপোষের মাধ্যমে মীমাংসা করার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়ে থাকে।

০৬:০১ – ০৭:০০ এখন এই বিষয়টা আমরা আসলে অত বেশি প্রমোট করি না কখনও। আমাদের দেশে অনেক মামলা রয়েছে যেগুলা আদালত পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজনই নাই। আমরা চাইলে ঘরোয়া পরিবেশে সমাধান করতে পারি। চাইলে আমরা আমাদের অন্তত স্থানীয় যে সরকার রয়েছে, যেখানে সালিশি পরিষদ থাকে, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশন, সেখানেও যদি আমরা সালিশের মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করি, সহজেই সমাধান হয়ে যায়। এখন আমাদের প্রত্যেকটা থানাতেও সালিশ করা হয়। ওসির তত্ত্বাবধানে বা স্পেশাল কোন এসআই-এর তত্ত্বাবধানে সালিশ করা হয়। ওইখানেও যদি আমরা সালিশ করি, আমরা খুব দ্রুত যেকোনো সমস্যা নিষ্পত্তি করতে পারি। আমরা একটা জিনিস কখনও খেয়াল করি না যে আমি আমার ভাইকে বা আমার চাচাকে বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে মামলাগুলা হচ্ছে, সেগুলা আমরা যখন কোর্টে তুলি তখন সম্পর্কটা এত খারাপ পর্যায়ে চলে যায় যে আমরা ভবিষ্যতে কখনও কেউ কারো চেহারা দেখতে চাই না। আমি এমনও দেখেছি যে এক ভাই আরেক ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, মামলা চলমান, কয়েক বছর যাবত চলতেছে, দুই ভাইয়ের পরিবারও আলাদা হয়ে গেল, এক ভাইয়ের মৃত্যুতে আরেক ভাই জানাজায় আসতে সংকোচ বোধ করে। শুধুমাত্র সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে জানাজায় আসতে হয়। এই ধরনের জিনিসও দেখেছি শুধুমাত্র জমিজমার কিছু মামলা নিয়ে।

০৭:০১ – ০৮:০০ কিন্তু সেগুলা দিনশেষে কি হয়? শুধুমাত্র দুই পক্ষেরই টাকা খরচ হচ্ছে, সময় খরচ হচ্ছে, সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমরা এডিআর করলে, একটু ছাড় দিলে, একে অন্যে দুই পক্ষ থেকে একটু একটু ছাড় দিলেই সম্পর্কগুলা ঠিক থাকে। আর এতগুলা টাকা, আর্থিক ক্ষতিও হয় না, মানসিক ক্ষতিও হয় না আর নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কগুলাও নষ্ট হয় না। তাই আমাদেরকে প্রত্যেকটা স্টেজে, এমন নয় যে কোন মামলা এডিআর করা যাবে না, আপোষ করতে চাইলে, কারণ যেহেতু মামলাগুলা বেশিরভাগ মামলা ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি (Person to Person), আমরা দুই পক্ষ যদি আপোষ করতে চাই, কারো এখানে মাঝখানে কেউ নাই যে এটাকে আমাকে বাধা দিবে। শুধু স্পেসিফিক কিছু মামলা যেগুলো সাধারণত রাষ্ট্রবাদী থাকে, মার্ডার মামলার মত বড়সড় যে মামলাগুলা থাকে আর স্পেসিফিক রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা, যেগুলা সরকার আমার বিরুদ্ধে করছে, সেটা সরকারের সাথে আমার আপোষ করার কোন সুযোগ নাই। কিন্তু আমরা ব্যক্তিগতভাবে, সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে যে মামলাগুলা হয়, সেগুলা কিন্তু আমরা চাইলে যেকোনো স্টেজেই আপোষ করে ফেলতে পারি। এটা শুধু আমাদের ইচ্ছাশক্তি বাড়ে যে না আমরা আসলে একটু ছাড় দিব দুই পক্ষ থেকে, একটু একটু ছাড় দিব, দিয়ে আমরা সমাধান করে ফেলব। শুধু শুধু কোর্টের আঙিনায় একজন একজনকে দৌড়াব না।

০৮:০১ – শেষ আশা করি এডিআর সংক্রান্ত যে বিষয়টি রয়েছে সেটা আমরা একটা প্রাথমিক ধারণা দিতে পারলাম। এরপরও আমরা বিভিন্ন ভিডিওতে দেখানোর চেষ্টা করব কিভাবে এডিআর করতে হবে। কিভাবে এডিআর এর মধ্যে নিজের দাবিটুকু উপস্থাপন করা যেতে পারে। এবং যথেষ্ট সম্মানের সাথে কিভাবে এডিআর কার্যক্রম পরিচালনা করা যায় এবং নিজের পক্ষ থেকে নিজের সাইড থেকে যে দাবিটুকু থাকে বা যুক্তিটুকু থাকে, যেহেতু এখানে আদালতের বিষয় নেই, প্রমাণের জন্য উকিল নাই আপনার কাছে, তারপরও নিজের সাইড থেকে নিজের নথীগুলো বা নিজের যুক্তিটুকু, পয়েন্ট অফ ভিউটা কিভাবে আপনি তুলে ধরতে পারবেন, সেগুলো নিয়ে আমরা ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করব। আজকে এই পর্যন্তই, ধন্যবাদ।