ঢাকার উত্তরায় শায়লার সেই সাজানো সংসারটির দিকে তাকালে একসময় মনে হতো পূর্ণতার প্রতিচ্ছবি। ১১ বছরের দীর্ঘ পথচলায় কত শত স্মৃতি, কত হাসি-কান্নার গল্প জমেছিল সেই চার দেয়ালে। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই চেনা মানুষটিই যখন অচেনা হয়ে উঠতে শুরু করল, তখন ভালোবাসার চাদরটা ছিঁড়ে যেতে সময় লাগল না। বিচ্ছেদের সেই কালবৈশাখী ঝড় যখন শায়লার জীবনে আছড়ে পড়ল, তখন তিনি নিজের নিঃস্ব হওয়ার চেয়েও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তার ৪ বছরের ফুটফুটে ছেলে আর ৮ বছরের মায়াবী মেয়েটিকে নিয়ে। যে সন্তানদের তিনি নিজের শরীরের অংশ মনে করে আগলে রেখেছেন, বিচ্ছেদের পর সেই সন্তানদেরই কেড়ে নেওয়ার হুমকি যখন তার কানে এল, তখন শায়লার চারপাশটা যেন হঠাত করেই অন্ধকার হয়ে গেল। বিচ্ছেদের আইনি কাগজগুলোর চেয়েও তার কাছে বেশি ভারী মনে হচ্ছিল সন্তানদের হারানোর সেই অদৃশ্য ভয়।

ঢাকার আদালত পাড়ার এই কর্মব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন যখন শায়লার মতো অসংখ্য মায়ের চোখের জল দেখি, তখন আইনের ছাত্র হিসেবে বইয়ে পড়া সেই শুষ্ক ধারাগুলো হৃদয়ে এক অন্যরকম হাহাকার তৈরি করে। একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে যখন আমি কলম ধরি, তখন কেবল আইনি সমাধান নয়, বরং এই মানবিক সংকটগুলোকে সমাজের সামনে তুলে ধরাই থাকে আমার মূল লক্ষ্য। শায়লা যখন অঝোরে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, “আমার কি ওদের কাছে রাখার কোনো অধিকার নেই?”-তখন তার সেই আকুতি কেবল একজন মায়ের নয়, বরং বিচ্ছেদের কবলে পড়া হাজারো নারীর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল। এই ভয় আর অনিশ্চয়তা দূর করতেই আইনের সেই রক্ষাকবচগুলো জানা প্রয়োজন, যা একজন মাকে তার মাতৃত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে দেয় না।

বাংলাদেশের প্রচলিত পারিবারিক আইন ও মুসলিম বিধান অনুযায়ী, বিচ্ছেদের পরও সন্তানদের কাছে রাখার ক্ষেত্রে মায়ের অধিকার অত্যন্ত সুসংহত। সাধারণত একটি ছেলে সন্তান সাত বছর বয়স পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এবং একটি মেয়ে সন্তান বয়ঃসন্ধিকাল বা সাবালিকা না হওয়া পর্যন্ত মায়ের হেফাজতে থাকার প্রধান দাবিদার। এমনকি দাম্পত্য জীবনের তিক্ততার জেরে মা যদি পরিস্থিতির চাপে পড়ে স্বামীর ঘর ত্যাগ করতে বাধ্য হন, তবুও তিনি সন্তানদের নিজের কাছে রাখার সহজাত অধিকার হারান না। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা জরুরি, যা আদালত পাড়ায় প্রতিনিয়ত আমরা ব্যাখ্যা করি—সেটি হলো ‘অভিভাবকত্ব’ এবং ‘হেফাজত’। আইনত পিতা হলেন সন্তানের স্বাভাবিক অভিভাবক এবং তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করতে তিনি বাধ্য, কিন্তু সন্তানের শারীরিক সান্নিধ্য বা জিম্মাদারী নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত মায়ের কাছেই অর্পিত থাকে।

আইনি বিশ্লেষণের গভীরে গেলে দেখা যায়, আদালত যখন সন্তানের হেফাজতের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন, তখন কোনো যান্ত্রিক ধারা নয়, বরং ‘সন্তানের সর্বোচ্চ কল্যাণ’ বিষয়টিকেই ধ্রুবতারা হিসেবে বিবেচনা করেন। বিচারক কেবল সন্তানের বয়স বা লিঙ্গ দেখেন না, বরং দেখেন কার কাছে থাকলে শিশুটি শারীরিক ও মানসিকভাবে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ থাকবে এবং কার ছায়ায় তার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। প্রস্তাবিত অভিভাবকের চারিত্রিক সক্ষমতা এবং সন্তানের সাথে তার আত্মীয়তার নৈকট্যও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। মায়ের পুনর্বিবাহ নিয়ে অনেকের মনে সংশয় থাকলেও, উচ্চ আদালতের বিভিন্ন যুগান্তকারী রায়ে এখন এটি প্রতিষ্ঠিত যে, যদি প্রমাণ হয় মায়ের কাছে থাকাই সন্তানের মঙ্গলের জন্য অপরিহার্য, তবে মা দ্বিতীয় বিয়ের পরও সন্তানের হেফাজত পেতে পারেন।

তবে এই আইনি লড়াইয়ের পথে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা শ্রেয়। মা হিসেবে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকার পাশাপাশি মনে রাখতে হবে যে, সন্তানদের ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা বাবার আইনি বাধ্যবাধকতা। কোনো পক্ষই যাতে সন্তানদের আবেগ নিয়ে কোনো নিষ্ঠুর খেলা খেলতে না পারে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা প্রয়োজন। আদালত পাড়ায় একজন নিয়মিত আইনজীবী হিসেবে আমি সব সময় বিশ্বাস করি, বিচ্ছেদের তিক্ততা যেন কোনোভাবেই একটি শিশুর শৈশবকে বিষিয়ে না তোলে। সঠিক সময়ে সঠিক আইনি পদক্ষেপ আর ধৈর্যই পারে শায়লার মতো মায়েদের সন্তানদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে।

পুরো আর্টিকেল শেষে উল্লেখযোগ্য পয়েন্ট গুলো ছোট পরিসরে নীচে দিয়ে দিলাম যাতে সহজের বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনবোধে স্ক্রিনশট নিয়ে রাখতে পারেন। 

১. সন্তানদের জিম্মাদারী (Custody)

  • পুত্র সন্তান: ৭ বছর বয়স পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত মা সন্তানের জিম্মাদারী পাবেন।
  • কন্যা সন্তান: বয়ঃসন্ধিকাল (Puberty) না হওয়া পর্যন্ত কন্যা সন্তান মায়ের কাছেই থাকবে।
  • বিচ্ছেদ পরবর্তী অধিকার: বিচ্ছেদ হলেও মা সন্তানদের নিজের কাছে রাখার অগ্রাধিকার হারান না। এমনকি পরিস্থিতির চাপে ঘর ছাড়তে বাধ্য হলেও তিনি সন্তানদের হকদার।

২. অভিভাবকত্ব বনাম হেফাজত

  • পিতার ভূমিকা: মুসলিম আইন অনুযায়ী পিতা হলেন সন্তানের স্বাভাবিক এবং আইনগত অভিভাবক। সন্তানের যাবতীয় ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পিতার।
  • ভরণ-পোষণ: সন্তান মায়ের কাছে থাকলেও তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বা ভরণ-পোষণ (Maintenance) দিতে পিতা আইনত বাধ্য।

৩. আদালতের সিদ্ধান্ত ও বিবেচ্য বিষয়

আদালত যখন সন্তানের জিম্মাদারী নির্ধারণ করেন, তখন প্রধানত যে বিষয়গুলো দেখেন:

  • সন্তানের সর্বোচ্চ কল্যাণ: শিশুর মঙ্গল ও সুন্দর ভবিষ্যৎ কোন দিকে নিহিত (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)।
  • পরিচয় ও বয়স: সন্তানের বয়স, লিঙ্গ এবং ধর্ম।
  • সক্ষমতা: জিম্মাদারের চারিত্রিক সক্ষমতা এবং সন্তানের সাথে তার আত্মীয়তার নৈকট্য/আত্মিক টান।

৪. বিশেষ পরিস্থিতি ও সাবধানতা

  • পুনর্বিবাহ: মা দ্বিতীয় বিবাহ করলে সাধারণত জিম্মাদারী হারান। তবে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যদি প্রমাণ হয় যে দ্বিতীয় বিবাহের পরও মায়ের কাছেই সন্তান বেশি ভালো থাকবে, তবে আদালত মায়ের কাছেই সন্তান রাখার আদেশ দিতে পারেন।
  • জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়া: স্বামী বা তার পরিবার সন্তানদের জোরপূর্বক সরিয়ে নিতে চাইলে বা বাধা দিলে, দেরি না করে পারিবারিক আদালতে মামলা করে প্রতিকার চাওয়া যায়।

অভিভাবকত্বের এই আইনি লড়াইয়ে একজন আইনজীবী হিসেবে মামলা জেতার চেয়েও আমার কাছে বড় সার্থকতা হলো, একটি সুন্দর আপোষে মীমাংসা করানো। কারণ যখন বিবাদ মিটে যায়, তখন আর কেউ না জিতলেও অন্তত সন্তানটা জিতে যায়। বিচ্ছেদের বাস্তবতায় হয়তো জীবনটা আর আগের মতো অখণ্ড থাকে না; তবুও খণ্ড খণ্ড স্মৃতিতে, বিচ্ছিন্ন মুহূর্তগুলোতে সে যেন বাবা এবং মা, উভয়কেই নিজের পাশে পায়। দিনশেষে আইনি জয়ের চেয়েও একটি শিশুর শৈশব রক্ষা পাওয়াই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

Subscribe

Subscribe to get an inbox of our latest blog.