বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য ১৮৮১ সালের ‘দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট’ (NI Act) অনুযায়ী মামলা করার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশসহ আমাদের উপমহাদেশের আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং সময়সাপেক্ষ হয়ে থাকে। বিশেষ করে আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধ বা চেক ডিজঅনারের মামলাগুলোতে আইনি লড়াই অনেক দূর পর্যন্ত গড়ায়। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করে দায়রা আদালতে বদলী হয়ে মামলার শুনানি শুরু হতে হতেই বছর খানিকের বেশি সময় লেগে যায়। নানাবিধ ব্যক্তিগত জটিলতা ছাড়াও কেবল এই সময়ের দীর্ঘসূত্রিতার কারনেই অনেক সময় মামলার বাদী বা অভিযোগকারী নিজে সশরীরে আদালতে উপস্থিত থেকে নিয়মিত হাজিরা দিতে বা মামলা তদারকি করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে আইনি প্রতিকার পেতে নিজে সশরীরে উপস্থিত না হয়ে অন্য কাউকে প্রতিনিধি করে চেকের মামলা করে আপনি প্রতিকার পেতে পারেন, যার জন্য আপনাকে আপনার একজন প্রতিনিধি নিয়োগ করতে হবে, যাকে আমরা আইনের ভাষায় বলে থাকি, ‘পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি’ বা ‘আমমোক্তার’। 

কেন এবং কখন আপনি নিজের মামলা অন্যকে দিয়ে পরিচালনা করতে পারবেন?

বিভিন্ন কারনেই আপনি নিজে আদালতে উপস্থিত না হয়ে অন্য কাউকে আপনার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে মামলা পরিচালনা করতে পারেন। সাধারণত যেসব কারনে নিজের মামলার অন্য কাউকে দিয়ে পরিচালনা করতে পারবেন, সেগুলো নিম্নে দেওয়া হলঃ  

  • বিদেশে অবস্থান: জীবিকা বা শিক্ষার প্রয়োজনে বিদেশে অবস্থান করলে নিয়মিত আদালত হাজির হওয়ার এবং নিজের মামলা বাদী হিসেবে পরিচালনা করা অসম্ভব। এক্ষেত্রে আমমোক্তারনামা দেওয়া কার্যত বাধ্যতামূলক। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার নিজের পরিবারের একজন সদস্য এবং একাধিক বন্ধুর মামলায় আইনজীবী এবং আমমোক্তার। কেননা, তারা প্রবাসে অবস্থান করে কিন্তু দেশে বিভিন্ন মানুষের কাছে টাকা পাবে, যার ফলে তাদের হয় আমি মামলা দায়ের করে উক্ত মামলা পরিচালনা করতেছি। 
  • পেশাগত ব্যস্ততা: গুরুত্বপূর্ণ পেশায় (যেমন: ডাক্তার, প্রকৌশলী বা ব্যবসায়ী) নিয়োজিত ব্যক্তিরা আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা ও বারবার হাজিরা এড়াতে আমমোক্তার নিয়োগ করেন। তাছাড়া, আপনার কর্মস্থল এক জেলায়, মামলা আরেক জেলায় হলেও তখন আপনি আমমোক্তার নিয়োগ করতে পারেন। 
  • শারীরিক অক্ষমতা ও বার্ধক্য: বয়সজনিত কারণ বা গুরুতর অসুস্থতার কারণে আদালতে সশরীরে উপস্থিত হওয়া কষ্টসাধ্য হলে প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারেন। তাছাড়া আমাদের দেশের বেশীর ভাগ পরিবারের নারী সদস্যরাও আদালতে উপস্থিত হয়ে মামলা পরিচালনা করতে অস্বস্তিবোধ করেন। সেক্ষেত্রে, তিনি একজনকে আমমোক্তার নিয়োগ মামলা দায়ের এবং পরিচালনা করতে পারেন।  
  • যৌথ পাওনাদার: পাওনাদার একাধিক হলে সবার পক্ষে আসা কঠিন, তখন একজন আমমোক্তার সবার প্রতিনিধিত্ব করেন। 

এছাড়াও, যেকোনো যৌক্তিক কারনে আপনি চাইলে আপনার হয়ে অন্য কাউকে মামলা করার ক্ষমতা দিয়ে নিজে নিজের কর্মস্থলে থেকেও মামলা দায়ের এবং পরিচালনা করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই মাথায় রাখবেন, আপনার আমমোক্তার যেন আপনার বিশ্বস্ত হয়। 

চলুন এবার দেখে নেওয়া যাক, মামলা করার জন্য একটি আমমোক্তার নামা কিভাবে তৈরি করা যায়। নিম্নে মামলা করার একটি বিশেষ আমমোক্তারনামার মধ্যে কি কি থাকবে, সেগুলো পয়েন্ট আকারে ব্যাখ্যা করা হলঃ   

১. দাতা ও গ্রহীতার পূর্ণাঙ্গ পরিচয়

যেকোনো চুক্তিতে পক্ষগণের পরিচয় নিশ্চিত করা হল, প্রথম ও প্রধান শর্ত। দাতা (যিনি ক্ষমতা দিচ্ছেন) এবং গ্রহীতা (যিনি ক্ষমতা পাচ্ছেন)—উভয়ের নাম, পিতা-মাতা, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা, জন্ম তারিখ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়। এটি নিশ্চিত করে যে, ভবিষ্যতে অন্য কোনো ব্যক্তি নিজেকে দাতা বা গ্রহীতা বলে দাবি করতে পারবে না।  

২. মামলার প্রেক্ষাপট অংশ

এই অংশটি হচ্ছে, আমমোক্তারনামা দলিলের মূল অংশ বা বলা যায় হৃৎপিণ্ড। এখানে বিস্তারিত বর্ণনা করতে হয় কেন মামলাটি করা হচ্ছে। যেই ব্যক্তি(আসামী)’র নামে মামলা করার হবে, সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেন মামলাটা করা হচ্ছে, বিস্তারিত একটি পটভূমি তৈরি করে নিতে হবে। যেমন, আমরা যেহেতু এই আর্টিকেলে শুধু চেকের মামলা নিয়ে কথা বলছি, তাই চেকের মামলার জন্য আমমোক্তারনামার মধ্যে উল্লেখ করতে হবে, ক্ষমতা যিনি দিচ্ছেন তিনি কিসের ভিত্তিতে আসামীর বিরুদ্ধে টাকা পাবেন, আসামী কয়টি চেক দিয়েছে, কোন ব্যাংকের কোন একাউন্টের বিপরীতে চেকগুলো দিয়েছে, চেকে টাকার পরিমাণ, চেকের তারিখ, Dishonor এর তারিখ, Dishonor এর কারন, Dishonor করা ব্যাংক ইত্যাদি ইত্যাদি। 

৩. আমমোক্তার/প্রতিনিধি নিয়োগের যৌক্তিক কারণ

পাওয়ার অফ এটর্নি বা আমমোক্তারনামা দলিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হয় কেন দাতা নিজে মামলা পরিচালনা করতে পারছেন না। যেমন—ব্যবসায়িক ব্যস্ততা বা বিদেশ গমনের প্রয়োজনীয়তা। আদালত যেন বুঝতে পারে যে দাতা স্বেচ্ছায় এবং যৌক্তিক কারণে প্রতিনিধি নিয়োগ করছেন, কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে নয়।

৪. কার্যাবলীর পরিধি ও ক্ষমতার ব্যাপ্তি

আমমোক্তারনামায় গ্রহীতাকে যে ক্ষমতাগুলো দেওয়া হয়, তার সীমা সুনির্দিষ্ট থাকা উচিত। মামলা পরিচালনা করার জন্য সাধারণত যে যে ক্ষমতা দেওয়া যথেষ্ট, সেগুলো নিম্নরূপঃ 

  • মামলা দায়ের ও পরিচালনা: নিম্ন আদালতে মামলা দায়ের থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত আপিল, রিভিউ, রিভিশন বা যেকোনো দরখাস্ত বা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন।  
  • স্বাক্ষর ও জবানবন্দি: আরজি, লিখিত জবাব, ওকালতনামা এবং হলফনামায় স্বাক্ষর করা। এমনকি দাতার অনুপস্থিতিতে আদালতে জবানবন্দি বা সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া যায়।
  • আইনজীবী নিয়োগ: গ্রহীতা প্রয়োজনবোধে কোনো আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবেন।
  • আপোষ-মীমাংসা: মামলার যেকোনো পর্যায়ে বিবাদীর সাথে স্থানীয়ভাবে বা আদালতের মাধ্যমে আপোষ করার ক্ষমতা। এটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে সাহায্য করে।

৫. দাতার দায়বদ্ধতা ও আইনি সুরক্ষা

আমমোক্তারনামা দলিলে একটি ক্লজ থাকে যে, “আমমোক্তার যা করবেন, তা দাতা নিজে করেছেন বলে গণ্য হবে।” আমমোক্তার যদি কোনো আইনি ভুল করেন বা কোনো পদক্ষেপ নেন, তবে দাতা পরবর্তীতে তা অস্বীকার করতে পারবেন না। তাই আমমোক্তার নিয়োগের ক্ষেত্রে সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা অপরিহার্য।

৬. তফসিলের গুরুত্ব

তফসিল হলো মামলার বিষয়ের সুনির্দিষ্ট তালিকা। চেক ডিজঅনার মামলার ক্ষেত্রে প্রতিটি চেকের নম্বর, ব্যাংকের নাম, তারিখ এবং টাকার পরিমাণ আলাদাভাবে উল্লেখ করা আবশ্যক। তফসিল অস্পষ্ট হলে আমমোক্তারনামাটি ত্রুটিপূর্ণ বলে গণ্য হতে পারে। 

১৮৮১ সালের এনআই অ্যাক্টের মামলায় পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:

১. ষ্ট্যাম্পঃ ৮০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্পে উক্ত বিশেষ আমমোক্তারনামা দলিলটি প্রিন্ট করতে হবে।

২. সাক্ষী: কমপক্ষে দুইজন সাক্ষীর স্বাক্ষর নিতে হবে।  

৩. নোটারিঃ মামলার জন্য ‘বিশেষ আমমোক্তারনামা’ সাধারণত নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সম্পন্ন করে নিতে হবে। 

এরপর উক্ত ‘বিশেষ আমমোক্তারনামা’র ফটোকপি করে সেটি মামলার আর্জির সাথে জমা দিয়ে মামলা করতে হবে। তবে, মূল কপি সাথে রাখতে হবে, যদি আদালত দেখতে চায় তখন দেখাতে হবে। এরপর পুনরায় সাক্ষীর সময় আদালতে এটি জমা দিতে হবে, তাছাড়া মামলার প্রয়োজনবোধে এর আগেও প্রয়োজন হলে তখন সেটি উপস্থাপন করতে হবে। সবমিলিয়ে, শুধু আদালতে যাওয়া আসা, সময়ের দীর্ঘসূত্রিতা, প্রবাস-জীবন, ব্যস্ততাসহ সকল সমস্যার সমাধান করে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আদালতে মামলা করতে নিজে না গিয়ে বিশেষ আমমোক্তারের মাধ্যমেই সমাধান করতে পারেন। আশা করি, বুঝতে পেরেছেন, ধন্যবাদ।

Subscribe

Subscribe to get an inbox of our latest blog.