রেস সাব জুডিস

রেস সাব জুডিস বা Stay of Suit

বিবিধ আইন

দেওয়ানী মামলা করার ক্ষেত্রে জমিজমার মত মামলা ছাড়া (যেখানে কোন স্থাবর বস্তু জড়িত), বাকি প্রায় সবক্ষেত্রে আপনি কোন জায়গায় মামলা করবেন এটা নিয়ে কোনো সংশয়ের প্রয়োজন নেই। কেননা দেওয়ানী মামলা বাদী যেখানে বসবাস করে বা বিবাদী যেখানে বসবাস করে অথবা মামলার বিষয়বস্তু যেখানে অবস্থান করছে সেখানে মামলা করা যায়। কিন্তু যদি কোন জমির মালিকানা শর্ত নিয়ে মামলা করা হয়, সেখানে জমি যেখানে অবস্থিত সেই জায়গায় মামলা করতে হবে। তবে, যখন কোন পারিবারিক আদালতে মামলা করার প্রয়োজন হবে, সেই ক্ষেত্রে ধরুন আপনি ঢাকায় আর আপনার স্ত্রী রয়েছে চট্টগ্রামে। এখন যদি আপনার স্ত্রীর ভরণপোষণের মামলা করার প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে স্ত্রী কোথায় মামলা করবে? স্ত্রী যেখানে বসবাস করছে অর্থাৎ চট্টগ্রামে মামলা করতে পারে আবার স্ত্রী যদি ইচ্ছা করে তাহলে আপনি ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে আপনার আবাসস্থল বা কর্মস্থল ঢাকাতেও মামলা করতে পারবে। এখন যে মামলাগুলো একাধিক আদালতে দায়ের করার মত অর্থাৎ ঢাকা জেলাতেও মামলা করা যাচ্ছে আবার চট্টগ্রামের আদালতেও মামলা করা যাচ্ছে, ওইসব মামলার ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় যে, কিছু কিছু বাদি মামলায় বিবাদীকে হয়রানি করার জন্য একাধিক আদালতে মামলা করে থাকে। উদাহরণ দিলে হয়তো বিষয়টি পরিষ্কার হবে, ধরুন চট্টগ্রাম আদালতে একজন মহিলা তার স্বামীর বিরুদ্ধে ভরণপোষণের মামলা করল। কিছুদিন পর বুঝতে পারলো যে, এই আদালতের মামলার রায় তার বিরুদ্ধে যাওয়ার পথে, তখন সে চালাকি করে গোপনে গিয়ে ঢাকার পারিবারিক আদালতে স্বামীর বিরুদ্ধে ভরণপোষণের মামলা ঠুকে দিল। যেহেতু এখনও পর্যন্ত আমাদের দেশের পুরো জুডিশিয়ারি অনলাইনের আওতাভুক্ত হয়নি, সেই ক্ষেত্রে ঢাকার একজন পারিবারিক আদালতের পক্ষে কোন ভাবে বুঝার সম্ভাবনা নাই যে, একই বিষয়বস্তু নিয়ে চট্টগ্রামে একটি মামলা ইতিমধ্যে চলমান। সেক্ষেত্রে তিনি মামলাটি গ্রহণ করে নিবেন কিন্তু ঢাকার আদালতে মামলা গ্রহণ করার পরে যখন বিবাদীকে সমান পাঠাবে, তখন বিবাদী তার আইনজীবীর মাধ্যমে যদি ঢাকার আদালতকে জানাতে পারেন যে, একই বিষয়বস্তু নিয়ে চট্টগ্রাম আদালতে ইতিমধ্যে একটি মামলা চলমান, সেই ক্ষেত্রে ঢাকার আদালত ঢাকায় করা মামলাটির বিচার কার্য স্থগিত করে মূলতবি ঘোষণা করবেন।

এই যে একটি মামলা চলমান থাকার দরুন একই বিষয়ে আরেকটি মামলা চলার পথে স্থগিত করে দেওয়ার আদালতের এই ক্ষমতার নীতিকে বলা হয় মামলা স্থগিতকরণ বা Stay of suits বা রেস সাব জুডিস। দেওয়ানী কার্যবিধি ১৯০৮ এর ১০ ধারায় মামলা স্থগিত করার এই ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে, তবে এর জন্য একাধিক শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন,

  • ইতিমধ্যে চলমান অর্থাৎ পূর্ববর্তী মামলার পক্ষ পরবর্তী মামলার পক্ষগণ অবশ্যই একই হতে হবে।
  •  শুধুমাত্র পক্ষগণ নয় মামলার বিষয়বস্তুও উভয় মামলাতে এক হতে হবে।
  •  পাশাপাশি প্রথম আদালত যেখানে প্রথম মামলাটি করা হয়েছে সেই আদালতেরই যদি দ্বিতীয় মামলায় কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার দেওয়ার ক্ষমতা থেকে থাকে তাহলেও মামলা স্থগিত করা সম্ভব।



এখন কথা হচ্ছে এই ধরনের মামলা স্থগিত করার প্রক্রিয়ার পিছনে কি কারণ রয়েছে?
যদি আমরা কিছু মুহূর্তের জন্য ধরে নেই যে, একই বিষয়ে একাধিক আদালতে একই পক্ষগণের মধ্যে মামলার বিষয়ে কোনো বাধা নেই, তাহলে আপনার কাছে কি মনে হয়, তাহলে মামলার সংখ্যা কি এখন যা রয়েছে তার চেয়ে বেশি হয়ে যাবে না? এখন কোন পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা করে সন্তুষ্ট থাকে কিন্তু এই প্রক্রিয়া যদি না থাকতো অর্থাৎ রেস সাব জুডিস যদি না থাকতো তাহলে যার টাকা-পয়সার রয়েছে বা সামর্থ্য রয়েছে, সে বিভিন্ন কোর্টে গিয়ে একই বিষয়বস্তু নিয়ে একই বিবাদীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতো। এটা বিবাদীর জন্য যেমন হয়রানিমূলক তেমনি আদালতের জন্য সময় নষ্ট হওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় উপাদান। এমনিতে সারা বাংলাদেশে আদালতগুলোতে মামলার যে পরিমাণ জট লেগে রয়েছে, তার উপর যদি একই বিষয়বস্তু নিয়ে একই পক্ষগুলোর মধ্যে একাধিক মামলা হয়, তাহলে আর ন্যায়বিচারের জন্য আদালতে গিয়ে উপযুক্ত সময় এর মধ্যে কোন ধরনের প্রতিকার পাওয়া সম্ভব নয়। বলা চলে এভাবে মামলার জট যদি ক্রমে বাড়তে থাকে তাহলে আদালতে সঠিক সময়ে মামলার বিচার কার্য সম্পন্ন করতে পারবেন না।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, একই বিষয়ে একই পক্ষগণের মধ্যে একাধিক আদালতে যদি একই সময়ে মামলা চলে সেক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধী ডিগ্রী পাস হওয়ার মত অবস্থা যে হবে না তা কিন্তু বলা যায় না। কারণ একটি মামলার রায় নির্ভর করে মামলাতে যে প্রতিকারগুলো চাওয়া হয়েছে সেগুলোর বিপরীতে সঠিক সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে কিনা। এখন আইনজীবী ভেদে মামলার বিষয়বস্তু উপস্থাপনে ভিন্নতা আসে। তেমনি ভিন্ন ভিন্ন আদালতে ভিন্ন ভিন্ন আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা পরিচালনা করার কারণে একই বিষয়বস্তু হওয়া সত্বেও দুই আদালতে দুই ধরনের রায় হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেক্ষেত্রে দুই আদালতের মধ্যে কোন আদালতের রায় কার্যকর করা হবে এই বিষয় নিয়ে তখন আরো জটিলতা দেখা দিবে। এই কারণে রেস সাব জুডিসের মাধ্যমে মামলা স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে দেওয়ানী কার্যবিধির ১০ ধারার অধীনে কোন মামলার পরবর্তী কার্যক্রম স্থগিত রাখার আদেশ দিতে যদি না পারে, আদালত সেক্ষেত্রে ১৫১ ধারার অধীনে ন্যায় বিচারের স্বার্থে মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখার আদেশ দিতে পারবেন। তাহলে মূলত দেখা যাচ্ছে যে, ন্যায় বিচারের স্বার্থে পরবর্তী মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখা আবশ্যকীয়। এখন যেহেতু আদালত থেকে এই বিষয়টা জানতে পারেন না যে, কোন জায়গায় একই বিষয়ে মামলা ইতিমধ্যে চলমান তাই বিবাদী পক্ষের দায়িত্ব হচ্ছে বর্তমানে চলমান মামলার কাগজপত্র নিয়ে পরবর্তীতে যে আদালতে মামলা দায়ের করা হচ্ছে ওই আদালতে পূর্ববর্তী মামলার কাগজপত্রগুলো প্রদর্শন করে পরবর্তী মামলাটি রেস সাব জুডিস নীতি অনুসরণ করে স্থগিত করে দেওয়া।

close

Subscribe

Subscribe to get an inbox of our latest blog.